মস্তিষ্ক আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি। চিন্তা করা, শেখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, স্মৃতি ধরে রাখা এবং সমস্যা সমাধান, সবকিছুর সঙ্গেই মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা জড়িত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের কিছু ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তিত হতে পারে। তবে নিয়মিত কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ভালো রাখতে এবং স্মৃতি ও মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক এমন ১০টি অভ্যাস, যেগুলোর পেছনে বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমর্থন রয়েছে।
১. পর্যাপ্ত ঘুমকে গুরুত্ব দিন
ঘুম শুধু শরীরের বিশ্রামের জন্য নয়, মস্তিষ্কের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের শেখা তথ্যকে সাজিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে সংরক্ষণ করতে সাহায্য করে।
প্রতিদিন সাধারণত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুমের অভ্যাস করুন। ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার ও ক্যাফেইন গ্রহণ কমানোও উপকারী।
২. নিয়মিত ব্যায়াম করুন
শারীরিক ব্যায়াম মস্তিষ্কের জন্যও উপকারী। নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো, সাইক্লিং বা অন্য কোনো অ্যারোবিক ব্যায়াম মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়াতে এবং স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে।
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস দিয়েই শুরু করতে পারেন।
৩. নতুন কিছু শিখুন
মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখার অন্যতম ভালো উপায় হলো নিয়মিত নতুন কিছু শেখা। নতুন ভাষা, বাদ্যযন্ত্র, সফটওয়্যার, কোনো দক্ষতা বা নতুন বিষয় শেখার মাধ্যমে মস্তিষ্ককে চ্যালেঞ্জ দেওয়া যায়।
শুধু তথ্য পড়ার পরিবর্তে শেখা বিষয়টি নিজে প্রয়োগ করার চেষ্টা করুন।
৪. বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন
নিয়মিত বই পড়া মনোযোগ, ভাষাগত দক্ষতা, কল্পনাশক্তি এবং জ্ঞান বাড়াতে সাহায্য করে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাস আপনার ফোকাস ধরে রাখার ক্ষমতা উন্নত করতে পারে।
প্রতিদিন ১৫ থেকে ৩০ মিনিট বই পড়া দিয়ে শুরু করতে পারেন।
৫. স্বাস্থ্যকর খাবার খান
মস্তিষ্কের ভালো কার্যক্ষমতার জন্য সুষম খাদ্য গুরুত্বপূর্ণ। মাছ, বাদাম, শাকসবজি, ফল, ডাল, সম্পূর্ণ শস্য এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন।
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনি এবং অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট কম খাওয়াও ভালো অভ্যাস।
৬. একসঙ্গে অনেক কাজ করার চেষ্টা কমান
আমরা অনেক সময় ভাবি একসঙ্গে কয়েকটি কাজ করলে বেশি কাজ করা যায়। বাস্তবে বারবার কাজ পরিবর্তন করলে মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে।
এক সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার চেষ্টা করুন। মোবাইলের অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখাও ফোকাস বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
৭. নিয়মিত বিরতি নিন
একটানা দীর্ঘ সময় কাজ করলে মানসিক ক্লান্তি তৈরি হতে পারে। তাই কাজের মাঝে ছোট বিরতি নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতি ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট পর কয়েক মিনিটের জন্য উঠে হাঁটা, পানি পান করা বা চোখকে বিশ্রাম দেওয়ার অভ্যাস করতে পারেন।
৮. মানুষের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখুন
সুস্থ সামাজিক সম্পর্কও মস্তিষ্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, আলোচনা করা এবং সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া মানসিকভাবে সক্রিয় থাকতে সাহায্য করতে পারে।
একাকীত্বের পরিবর্তে অর্থপূর্ণ সামাজিক যোগাযোগকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করার চেষ্টা করুন।
৯. স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ করুন
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ মনোযোগ, স্মৃতি এবং সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, মেডিটেশন, হাঁটা, গান শোনা, প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানো বা নিজের পছন্দের কোনো কাজে সময় দেওয়া স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
১০. মস্তিষ্ককে নিয়মিত চ্যালেঞ্জ দিন
পাজল, দাবা, গণিতের সমস্যা, স্মৃতির অনুশীলন বা নতুন কোনো দক্ষতা শেখার মতো কাজ মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে পারে। তবে শুধু ব্রেন গেম খেললেই বুদ্ধিমত্তা বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সবচেয়ে ভালো ফল পেতে বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ধরনের মানসিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে শেখা, পড়া ও সমস্যা সমাধানের অভ্যাস যুক্ত করুন।
শেষ কথা
মস্তিষ্ককে তীক্ষ্ণ রাখার জন্য কোনো একটি ম্যাজিক ট্রিক নেই। বরং পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার, শেখার অভ্যাস, সামাজিক যোগাযোগ এবং স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণের মতো ছোট ছোট অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
আজ থেকেই সবকিছু একসঙ্গে পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। একটি অভ্যাস বেছে নিন, সেটিকে নিয়মিত করুন এবং ধীরে ধীরে অন্যগুলো যুক্ত করুন। আপনার শরীরের মতো মস্তিষ্কেরও যত্ন প্রয়োজন।
Suggested English Permalink: